বুধবার   ২৩ অক্টোবর ২০১৯   কার্তিক ৮ ১৪২৬   ২৩ সফর ১৪৪১

জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা নিন

কামরুল ইসলাম চৌধুরী

দৈনিক যশোর

প্রকাশিত : ০২:৫৯ পিএম, ১৪ জানুয়ারি ২০১৯ সোমবার

ফসল চক্রের পরিবর্তন কী টের পাচ্ছেন? প্রাণ বৈচিত্র্যের বেশ পরিবর্তন কী দেখতে পাচ্ছেন? শেফালি ফুল কী সময় মতো ফুটছে? শীতের পরিযায়ী পাখি কী একটু আগে পরে আসছে? ষড়ঋতুর দেশে এখন কি শরৎ, হেমন্তকাল ঋতুচক্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে? টের তো পাচ্ছি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপদাহ বাড়ছে। শৈত্যপ্রবাহ বাড়ছে।

জল ও বায়ুচক্রে টালমাটাল পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ছে। সাগর-মহাসাগর উত্তপ্ত হচ্ছে, লোনা জল উপকূলে ঢুকছে। ঋতুচক্রে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা সতর্কবাণী দিচ্ছেন, কার্বন নিঃসরণ না কমালে আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা আরও বাড়বে। তাদের কথা হল, জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ পুঁজিবাদী ভোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে হবে। কিন্তু সেই সতর্কবাণী উপেক্ষিত হয়েই চলছে। কার্বন নিঃসরণ কমছে না, বরং বেড়েই চলেছে।

১৯৯২ সালের গৃহীত জাতিসংঘ জলবায়ু সনদ শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলোর অনেকেই মানছে না। ফলে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ঘন ঘন আঘাত হানছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা দেশে। জলবায়ুর অভিঘাতে জাতীয় আয়ের দুই-তিন শতাংশ ফি বছর তলিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু উদ্বাস্তুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি দেড় ডিগ্রির মধ্যে রাখতে হবে। কে শুনছে কার কথা? খ্রিস্টীয় ২০১৯ সাল শুরু হয়ে গেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ (এসডিজি) অর্জনে সামনে রয়েছে মাত্র এগারো বছর। মনে রাখতে হবে, এসডিজি’র ১৭টি অভীষ্টের ১৩ নম্বর লক্ষ্য হল জলবায়ু।

প্যারিস চুক্তির অধীনে অভিযোজন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন লক্ষ্য অর্জনের পথেও রয়েছে কেবল সামনের ১১ বছর। সময় দ্রুত এগোচ্ছে, এর মধ্যে অভীষ্টগুলো অর্জন করতে হবে।

এখন প্রশ্ন হল, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন কেমন হবে? কীভাবে স্বাভাবিক উন্নয়ন থেকে এটি ভিন্ন? জাতিসংঘ জলবায়ু অভিযোজন কমিটির সাবেক সদস্য হিসেবে আমি জানি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে অভিযোজন এখনও সঠিকভাবে পরিমাপ করা কঠিন। অভিযোজন বিজ্ঞান এ পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অভিযোজনের তিনটি পর্যায় চিহ্নিত করেছে। প্রথম পর্যায়টি হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রতিকূল প্রভাবগুলো মূল্যায়ন করা এবং যাচাই করা আমরা এমন কিছু করছি কিনা।

যা আমাদের সেই প্রভাবগুলোর জন্য আরও ঝুঁকির সম্মুখীন করে তুলছে। যদি তাই হয়, তাহলে আমাদের নিজেদের আরও ঝুঁকির সম্মুখীন করার প্রয়াস বন্ধ করতে হবে। ভালো হয় যদি আমরা প্লাবন ভূমিতে ভাসমান ভবন নির্মাণ করতে পারি। জলবায়ু ঝুঁকি কমাতে হবে। সে জন্য সুন্দরবনকে যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে।

কারণ সুন্দরবন বাংলাদেশকে ঘূর্ণিঝড় থেকেই শুধু রক্ষা করে না, কার্বন সিন্কও তৈরি করে। সুন্দরবন একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন করে। পরিবেশবিনাশী পদক্ষেপগুলো নেয়া বন্ধ করতে হবে। পানি, বায়ু ও মাটি দূষণ ঠেকাতে হবে।

অভিযোজনের দ্বিতীয় পর্যায়ে আমরা এখন রয়েছি। তাই, আমাদের এখন দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগুলোতে বিনিয়োগ যেমন- সেতু, রাস্তা, বিমানবন্দর এবং নৌবন্দরগুলোর বিষয় বিবেচনা করতে হবে। যাতে সেগুলো ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহিষ্ণু হয়। এখন সারা বিশ্বে সব বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও আমাদের তা বিবেচনা করতে হবে।

অভিযোজনের তৃতীয় পর্যায়টিকে রূপান্তরমূলক অভিযোজন বলা হয়। যা এখনও কিছুটা তাত্ত্বিক পর্যায়ে রয়েছে। এখনও তেমন কোনো ভালো নজির নেই। কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলোর ঝুঁকি মোকাবেলা নয় বরং অভিযোজন ব্যবস্থার ভালো ফল লাভের জন্যও এটি প্রযোজ্য।

সেই ১৯৯০-এর দশকে জাতিসংঘ জলবায়ু সনদের অধীনে স্বল্পোন্নত ৪৯টি দেশের শীর্ষ অভিযোজন নেগোসিয়েটর হিসেবে আমি বাংলাদেশসহ এ সব দেশে জাতীয় অভিযোজন কর্মপরিকল্পনা (নাপা) প্রণয়নের দাবি তুলেছি। জলবায়ু সনদের অর্থায়নে বাংলাদেশ ২০০৫ সালে নাপা প্রণয়ন করে।

স্বল্পোন্নত সব দেশ নাপা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করে। জাতিসংঘ জলবায়ু সনদে নেগোসিয়েটরের পর নাপার ওপর ভিত্তি করে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (নাপ) প্রণয়নের দাবি তুলি ২০০৯ সালে কোপেনহেগেন জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে। যা পরবর্তী বছর ২০১০ সালে কানকুন এডাপটেশন ফ্রেমওয়ার্কের অংশ হিসেবে গৃহীত হয় আমার প্রস্তাব মোতাবেক। নেপালসহ বেশ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে এ পরিকল্পনা তৈরিও করে তা বাস্তবায়নে যাচ্ছে।

বাংলাদেশও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার পথ-নকশা ২০১৫ সালে তৈরি করে। সেই পথ-নকশার একজন প্রণেতা হিসেবে এবং জাতিসংঘ অভিযোজন কমিটির সাবেক সদস্য হিসেবে বলতে পারি, অবিলম্বে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করা দরকার।

জন অংশগ্রহণের ভিত্তিতে এ দলিলটি তৈরি করা প্রয়োজন। তাহলেই আগামী দশকে রূপান্তরমূলক অভিযোজন গ্রহণ করে বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনসহিষ্ণু দেশ হয়ে উঠতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলো প্রকৃতই রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের লক্ষ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বেশ কিছুটা এগিয়েছে। অভিযোজনকে আরও কার্যকরী করার বিষয়ে আমরা ইতিমধ্যে কিছু শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।

সেই অভিজ্ঞতার আলোকে প্রথম শিক্ষাটি হচ্ছে সত্যিকারের রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের জন্য একদশক বা তারও বেশি সময় লাগবে। অতএব স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি প্রকল্পভিত্তিক বিনিয়োগ এ ক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযুক্ত হবে না। বৈশ্বিক তহবিল যেমন- গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) ব্যবহারের জন্য এটি একটি সমস্যা। যা শুধু প্রকল্পে অর্থায়ন করে থাকে। তারা যদি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় রূপান্তরমূলক অভিযোজন কর্মসূচিতে সহায়তা দিতে চায় তাহলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিভিত্তিক জাতীয় কর্মসূচিতে অর্থায়ন করতে হবে।

দ্বিতীয় শিক্ষাটি হচ্ছে, সরকার ও সরকারের বাইরে বিশেষ করে বেসরকারি খাতসহ সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সম্পৃক্ত করা। অর্থাৎ কেবল সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে গোটা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে সরে আসা। প্রকৃত রূপান্তরমূলক যে কোনো পরিবর্তনে অবশ্যই প্রতিটি দেশের সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয় শিক্ষা হল রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের মাত্রা হতে হবে দেশজুড়ে। তা কেবল কোনো ছোট অঞ্চলে বা খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাই, এসব দেশে শুধু জাতীয় পর্যায়ে রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনা করতে হবে। মোটেও খাত পর্যায়ে নয়। ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবাতে অনুষ্ঠিত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মন্ত্রীদের সাম্প্রতিক বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জন এবং জলবায়ুসহিষ্ণুতা অর্জনের মাধ্যমে এলডিসি অবস্থান থেকে উত্তরণের চেষ্টা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

২০০৮ সালে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসএপি) আমরা তৈরি করি। ২০০৯ সালে তা সংশোধিত হয়। বাংলাদেশ প্রথম দেশ যে এটি করেছে। দশ বছর পর এখন এটি জন অংশগ্রহণের ভিত্তিতে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের দ্বারা হালনাগাদ করা প্রয়োজন। এ দলিলের অন্যতম প্রণেতা হিসেবে এটি আমার দাবি। তা হলে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল এবং কর্মপরিকল্পনার একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন দেখতে পাবে।

এটির মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো প্রয়োজন। সব জাতীয় পরিকল্পনার মূলধারায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দিতে হবে। এতে বাংলাদেশকে জলবায়ুসহিষ্ণু দেশে পরিণত করার জন্য রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এসডিজিগুলোর সঙ্গে ডেল্টা প্ল্যান এবং দেশের ৮ম ও ৯ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজনকে সংযুক্ত করে সমগ্র সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা দরকার। ব-দ্বীপ পরিকল্পনাটিকেও জনমতের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

রূপান্তরমূলক অভিযোজন কেমন হতে পারে তার একটি উদাহরণ দেয়া যায়। উপকূলবর্তী জেলাগুলোর লাখ লাখ মানুষকে অনিবার্য স্থানচ্যুতির বিষয়টি বিবেচনা ও প্রস্তুতির জন্য, আমাদের উপকূল থেকে দূরে একডজন শহরে বিনিয়োগ করতে হবে। যাতে এগুলো জলবায়ুসহিষ্ণু এবং অভিবাসী বন্ধুত্বপূর্ণ শহর হয়ে ওঠে। যেখানে কমপক্ষে এক লাখ অভিবাসীকে স্থান দেয়া যায়। উপকূলীয় এলাকার অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দিতে হবে। দক্ষ করে তুলতে হবে, যাতে তারা তাদের পিতা-মাতার মতো কৃষক হওয়া ও মাছ ধরার পরিবর্তে শহরগুলোতে ভালো বেতনে কাজ করতে পারে।

এই কৌশল রাজধানী ঢাকার ওপর চাপ কমাবে। এই মহানগরী আগামী দশকে আরও ১ কোটি জলবায়ু অভিবাসীদের স্থান দিতে পারবে না। এটি বাংলাদেশকে রূপান্তরমূলক অভিযোজনের উদাহরণ হিসেবে আমাদের সব তরুণ ও ভবিষ্যতের নাগরিকদের অভিযোজন সক্ষমতা তৈরির সাফল্য এনে দেবে।

দশ বছর আগে বাংলাদেশ নিজস্ব বাজেটে জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিল গঠন করেছে। এ তহবিল থেকে ইতিমধ্যে তিন হাজার কোটি টাকার উপর নানা জলবায়ু কর্মসূচিতে বরাদ্দও দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও যুক্তরাজ্য ও কয়েকটি দেশসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় জলবায়ু রেসাইলিয়েন্ট ফান্ড তৈরি করেছে। এখন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করার জন্য জাতীয় বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কর্মসূচি নিতে হবে।

বরাদ্দ দিতে হবে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জেলাগুলোতে। সবুজ জলবায়ু তহবিল বা গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, অ্যাডাপটেশন ফান্ড, এলডিসি ফান্ড এবং অন্যান্য বৈশ্বিক তহবিলগুলো থেকে অর্থায়ন পাওয়ার জন্য অভিযোজন ও প্রশমন কর্মসূচিগুলো প্রণয়ন ও পরিচালনার জন্য দক্ষতা ও সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি প্রয়োজন। জরুরি ভিত্তিতে শুরু করা প্রয়োজন দ্রুপদী গবেষণা ও জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কার্যক্রম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমফিল ও পিএইচডি কর্মসূচি অতি সত্বর চালু করা দরকার।

বাংলাদেশ ২০১৯ সালে এভাবেই তার পরিচিতিমূলক বিবরণ পাল্টাতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি থেকে বাংলাদেশ রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের মাধ্যমে সর্বাধিক সহিষ্ণু দেশে রূপান্তরিত হতে পারে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের মতো বাংলাদেশ তাহলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ অর্জনেও সামনের কাতারের দেশে রূপান্তরিত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে নেতৃত্ব দিতে পারবে। সময় এখন আমাদের। সফল আমাদের হতেই হবে।