রোববার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৬ ১৪২৬   ২২ মুহররম ১৪৪১

যশোর হবে দেশের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক কেন্দ্র

দৈনিক যশোর

প্রকাশিত : ১১:০৮ এএম, ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮ শনিবার

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন জেলা যশোর। বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীন জেলা ও প্রথম ডিজিটাল জেলাও এটি। ঢাকা-চট্টগ্রামের পর যশোর হতে পারে বাংলাদেশের তৃতীয় বাণিজ্যিক রাজধানী। বলেছেনে যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি এবং সফল ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা মিজানুর রহমান খান।

১৯৮২ সালে মাত্র ৫০০ টাকা পুঁজি নিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসার মাধ্যমে হাতেখড়ি হয় ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান খানের। ১৯৯৮ সালে যুক্ত হন আমদানি-রফতানি ব্যবসার সঙ্গে। গাংচিল গ্রুপের স্বত্বাধিকারী তিনি। বাংলাদেশে টি-কিং কমার্শিয়াল ট্রাকের কান্ট্রি ডিস্ট্রিবিউটর ও ফ্রেশ ফ্যাশনসের পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন।

যশোরের উন্নয়ন ও সম্ভাবনা প্রসঙ্গে একান্ত আলোচনায় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি মিজানুর রহমান খান বলেন, ব্রিটিশ-ভারতের প্রথম জেলা যশোরকে কেন্দ্র করে দেশের তৃতীয় বাণিজ্যিক রাজধানী গড়ে তোলা সম্ভব। দক্ষিণবঙ্গের বাণিজ্যিক কেন্দ্রস্থল যশোরের সামনে রয়েছে এমন সম্ভাবনার হাতছানি। রেল, সড়ক, আকাশ ও নৌপথের সুবিধা এই সম্ভাবনার দ্বারকে উম্মোচন করেছে। ফলে এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বঞ্চনার অবসান ঘটবে, বিস্তার হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির। এখানকার মানুষের রাজধানীমুখী হওয়ার প্রবণতাও কমে যাবে। যশোরের উন্নয়ন ও সম্ভাবনা নিয়ে এমনই অভিমত তার।

যশোর বিমানবন্দরকে আধুনিকায়নসহ যশোর অঞ্চলে একটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, যশোরের সঙ্গে দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোল ছাড়াও সাতক্ষীরার ভোমরা ও চুয়াডাঙ্গার দর্শনা স্থলবন্দরের সংযোগ রয়েছে। নৌ ও স্থলপথের মাধ্যমে যশোরের সঙ্গে খুলনার মোংলাবন্দরের কানেক্টিভিটিও রয়েছে। রয়েছে নওয়াপাড়া নৌবন্দর। সংস্কার করা হচ্ছে ভৈরব নদ। আছে বিমানবন্দরও।

তিনি আরও বলেন, যশোরের সঙ্গে ঢাকা, খুলনা, বেনাপোল ও কুষ্টিয়ার সড়কপথ প্রশস্ত হচ্ছে। সরকারের নতুন পরিকল্পনায় পদ্মা সেতু হয়ে যশোর-ঢাকা সরাসরি রেল যোগাযোগও হতে যাচ্ছে। আর খুলনা-যশোর হয়ে কলকাতার সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ তো শুরুই হয়ে গেছে। এ অবস্থায় যশোরে একটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হলে সহজে যশোর দেশের তৃতীয় বাণিজ্যিক নগরীতে পরিণত হবে।

মিজানুর রহমান খান বলেন, যশোর-খুলনা মহাসড়কের পাশে বসুন্দিয়া ও সিঙ্গিয়ায় ভৈরব নদের পাশে রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ জায়গা খালি পড়ে আছে। সরকার ইচ্ছা করলে এখানে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করতে পারে। এজন্য খুব বেশি খরচও হবে না। বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে সরকার বছরে যে পরিমাণ রাজস্ব আয় করে তার কিছু অংশ ব্যয় করে এখানে একটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা সম্ভব।

সুদীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার আলোকে মিজানুর রহমান বলেন, যশোর সবজি ভাণ্ডার থেকে প্রতিদিন কয়েক ট্রাক সবজি ঢাকায় যায়। ঢাকা থেকে এসব সবজির কিছু অংশ বিদেশেও রফতানি হয়। যশোর থেকে বিদেশে কার্গো বিমান চালু হলে সবজির পাশাপাশি এখানকার উৎপাদিত উন্নতমানের ফুল রফতানি করা সম্ভব। এ কারণে যশোর বিমানবন্দরকে আধুনিকায়ন করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ১৯৪১ সালে যশোর বিমানবন্দর নির্মিত হয়। এটি দেশের সবচেয়ে পুরনো বিমানবন্দর। কক্সবাজার থেকে চিংড়ি মাছের পোনা নিয়ে যশোর বিমানবন্দরে প্রতিদিন একাধিক কার্গো বিমান আসা-যাওয়া করে। সরকার উদ্যোগ নিলে চট্টগ্রাম থেকে যশোরের বিমানবন্দর ব্যবহার করে চিংড়ির পোনা দ্রুত সরবরাহ করার পাশাপাশি এ অঞ্চলের সবজি, হিমায়িত মৎস্য, ফুল ও অন্যান্য পণ্য স্বল্প ভাড়ায় রফতানির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে দ্রুত স্থানীয় শিল্পের প্রসার ঘটবে। কেননা এ অঞ্চল থেকে মাছ, মাছের পোনা, পোলট্রি, পোলট্রি ফিড, সবজি, ফুল প্রভৃতি পণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ দেশব্যাপী সরবরাহ করা হয়।

সফল ব্যবসায়ী ও যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক এ সভাপতি বলেন, যশোরের ওপর দিয়ে গ্যাসের পাইপলাইন গেছে খুলনায়। অথচ যশোরের মানুষ এর কোনো সুফল পাচ্ছে না। এ অঞ্চলের শিল্প-কারখানায় এই গ্যাস সরবরাহ করে এখানকার শিল্পের বিকাশে সহায়তা করার দাবি জানান তিনি।

যশোরে শিল্প-কারখানার মধ্যে রয়েছে স্পিনিং মিল, অটোরাইস মিল, হিমায়িত মৎস্য, প্লাস্টিক শিল্প, পোলট্রি ফিড, পাট ও পাটজাত শিল্প এবং অন্যান্য উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান। বিনিয়োগের নিরাপত্তা বিধান করা হলে এসব শিল্প ভবিষ্যতে আরও ভালো করবে এবং নতুন উদ্যোক্তারা এ অঞ্চলে শিল্প-কলকারখানা প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হয়ে উঠবে।

দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ রেণু পোনা উৎপাদন হয় যশোরে। মাছ উৎপাদনে এ জেলা এগিয়ে রয়েছে। দেশে উৎপাদিত ফুলের সিংহভাগ যশোরের ফুল চাষিরা উৎপাদন করেন। দেশে উৎপাদিত সবজির বড় অংশ এই যশোর থেকে সরবরাহ করা হয়। এই ফুল চাষি, সবজি চাষি আর রেণু পোনার হ্যাচারি মালিকদের সহযোগিতার জন্য বাজেটেও বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানান মিজানুর রহমান। সব মিলিয়ে বলা চলে, ঢাকা-চট্টগ্রামের পর সম্ভাবনার যশোরই হতে পারে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিককেন্দ্র।