বৃহস্পতিবার   ২৪ অক্টোবর ২০১৯   কার্তিক ৮ ১৪২৬   ২৪ সফর ১৪৪১

৮৯

বেপরোয়া কোচিং বাণিজ্যে নাভিশ্বাস শিক্ষার্থীদের

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  

স্কুল-কলেজের ৯৭ শতাংশই বেসরকারি। বাকি ৩ ভাগ সরকারি। এই সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অসাধু ও বেপরোয়া শিক্ষকদের কাছে রীতিমতো জিম্মি শিক্ষার্থী-অভিভাবক। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে শ্রেণীকক্ষের আদলে কোচিং সেন্টারগুলোতেই চলছে পাঠদান। শ্রেণীকক্ষ হয়ে পড়েছে গৌণ।

কোচিং বন্ধের নীতিমালা থাকার পরও তদারকির অভাবে গত সাড়ে ৬ বছরে তা কেবলই কাগুজে নীতিমালায় পরিণত হয়। তবে কোচিং বন্ধে সরকারের নীতিমালা বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট বৈধ বলে রায় দেয়ার পর এটি এখন নতুন করে আলোচনায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোচিং বাণিজ্য নামের এই ‘ঘাতক ব্যাধি’ আজ মহামারী রূপ পেয়েছে। এটা মাদকের মতো। কোচিং বন্ধের নীতিমালা বাস্তবায়নে সারা দেশে সরকারকে মনিটরিং টিম গঠন করার আহবান জানিয়েছে শিক্ষাবিদরা। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ নিয়ে কথা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, কোচিং নীতিমালা করাকে সরকারের সদিচ্ছা হিসেবেই আমরা দেখতে পারি। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস বাস্তবায়ন ও মনিটরিং না করাটা সদিচ্ছার পরিচায়ক নয়।

তিনি বলেন, শিক্ষা ব্যয় আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এর প্রধান কারণ কোচিং বাণিজ্য। কোচিং ব্যবস্থা মহামারী ও ঘাতক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার নামে ঢালাও বাণিজ্য হচ্ছে। এটা মাদকের মতোই আমাদের গ্রাস করছে। তাই কোচিং বন্ধে প্রণীত নীতিমালা বাস্তবায়নে আন্তরিক হতে হবে মন্ত্রণালয়কে।

অভিভাবকরা বলছেন, হাইকোর্টের রায়ের পর কোচিং বন্ধের নীতিমালা আরও শক্তি পেয়েছে। কোচিং বাণিজ্য নতুন করে আলোচনায় চলে এসেছে। সারা দেশে কোচিং বন্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেই এগিয়ে আসতে হবে। নীতিমালাটি সরকার ২০১২ সালে প্রণয়ন করলেও এর বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি এ পর্যন্ত। বরং ‘শিক্ষা বাণিজ্য’ নৈরাজ্য দিন দিন আরও বেড়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও সরেজমিন ঘুরে কোচিং বাণিজ্যের ভয়াবহতা টের পাওয়া গেছে। চলমান এসএসসি পরীক্ষার কারণে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোচিং বন্ধ থাকার কথা। কিন্তু কাঁচা টাকার নেশায় তা বন্ধ হয়নি। শুক্রবারও রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীতে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের আশপাশে শিক্ষার্থীদের কোচিং করে ফিরতে দেখা যায়।

ওই এলাকায় নটর ডেম কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস এমনকি আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষকদেরও ‘কোচিং বিপণি’ আছে। এছাড়া শুক্রবার ঢাকার কেরানীগঞ্জে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব সততা, এমআর, কনফিডেন্স এবং পাঠশালা নামে চারটি কোচিং সেন্টার বন্ধ করে দিয়েছে।

র‌্যাব-১০ ক্যাম্পের কমান্ডার মেজর সৈয়দ ইমরান হোসেন বলেন, অভিযানের সময় কোচিং সেন্টারগুলোতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করছিল। এসএসসির শনিবারের গণিত বিষয়ের পরীক্ষাও নিচ্ছিল কেউ কেউ।

অভিভাবকরা বলছেন, কোচিংবাজ শিক্ষকরা এতটাই ভয়াবহ যে তারা দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিবেচনায় নেন না।

রাজধানীর একটি নামি স্কুলের শিক্ষক বলছিলেন, তার ছেলে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও কলেজে ইংরেজি ভার্সনে পড়ত। তার ছেলে ‘ইমাম’ নামের একশ্রেণী শিক্ষকের কাছে না পড়ায় তাকে প্রায়ই মানসিক অত্যাচার করা হতো। একদিন ওই শিক্ষকেরই কোচিংয়ের ছাত্র ইমতি তার ছেলেকে মারধর করে এবং এতে তার ঠোঁট কেটে দেয়। কিন্তু ইমতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তার ছেলেকে এক মাসের জন্য স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কোচিং না করায় পরীক্ষার হলে আরেক ছাত্রকে পিটিয়ে হাত ভেঙে দেয়া হয়েছিল একই স্কুলে। ওই প্রতিষ্ঠানে কোচিংবাজদের রক্ষায় সিন্ডিকেট রয়েছে। ‘স’ আদ্যক্ষরের শিক্ষক সেই সিন্ডিকেটের হোতা বলে জানা গেছে। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে জাল সনদে উচ্চতর স্কেলের নামে সরকারের অর্থ গ্রহণের অভিযোগ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) তদন্তে প্রমাণিতও হয়েছে।

কোচিং নীতিমালা বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান যুগান্তরকে বলেন, নীতিমালার ব্যাপারে আদালতের রায় অত্যন্ত ইতিবাচক। এই নীতিমালা বাস্তবায়নের প্রধান কাজ মাউশির। এখন কিভাবে এটা বাস্তবায়ন করা যায়, সে ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে মাউশি।

তিনি বলেন, ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীর পড়াশোনা নিশ্চিত করা গেলে কোচিংয়ের কোনো প্রয়োজন হয় না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শিক্ষকদের বেপরোয়া আচরণের কারণেই ২০১১ সালে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের অভিভাবক মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু উচ্চ আদালতে রিট করেন। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোচিং বাণিজ্য বন্ধে ২০১২ সালে নীতিমালা করেই দায়িত্ব শেষ করেন।

নীতিমালা জারির পর গণস্বাক্ষরতা অভিযানের এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ৯০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট-টিউশন নিতে হচ্ছে। আর ৪ বছরের মাথায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় সমীক্ষায় (২০১৬) বলা হয়েছে, শিক্ষার পেছনে একজন অভিভাবকের মোট আয়ের ৫ দশমিক ৪২ ভাগ ব্যয় হয়। শিক্ষার পেছনে অভিভাবকের ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত কোচিং যা ৩০ শতাংশ।

রিটকারী মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে এখন শিক্ষা আর স্কুলে নেই, চলে গেছে কোচিং সেন্টারে। শিক্ষকদের ক্লাসরুমে ফিরে আনতে হবে। এটা করতে হলে কোচিং নিষিদ্ধ করতে হবে।

নাম প্রকাশ না করে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের এক শিক্ষকও কোচিং নীতিমালার সংশোধন ও হালনাগাদক দরকার বলে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, নীতিমালায় অনেক গ্যাপ আছে। ওই গ্যাপের সুযোগ নিয়ে অসাধুরা শিক্ষার্থীদের জিম্মি করবে। তবে ভিকারুননিসায় এ ধরনের শিক্ষক নেই বলে তার দাবি।

আবার এই নীতিমালায় কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ের কোচিং অবৈধ হয়েছে। কিন্তু ৩২ হাজার কোটি টাকার যে বাণিজ্য প্রাতিষ্ঠানিক কোচিং সেন্টারগুলো করে সেটি নীতিমালায় উঠে আসেনি। অথচ ওইসব প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নয়, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও পড়ায়।

এদিকে বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের রায়ের পর কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানের কোচিং বন্ধ হবে সেটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আলাদা বক্তব্য এসেছে। কেউ বলছেন, কেবল সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ আদেশ কার্যকর হবে।

তবে অনেকেই বলছেন, যেহেতু নীতিমালাকে আদালত বৈধ বলেছেন তাই সরকারি-বেসকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্যই এ নিয়ম কার্যকর।

এ সংক্রান্ত মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মোখলেছুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এ রায়ের ফলে সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ২০১২ সালের নীতিমালা কার্যকর। না মানলে ৬ ধরনের শাস্তি কার্যকরে কোনো বাধা থাকবে না।

উল্লেখ্য, সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী ক্লাসে পাঠদানের বাইরে মাসে বাড়তি ক্লাস নেয়ার জন্য যে পরিমাণ টাকা নেয়ার বিধান করা হয়েছে তার বাইরে কোনো কোচিং করানো যাবে না। অভিভাবকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানপ্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করতে পারবেন। মহানগরী এলাকার প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাসে তিনশ টাকা, জেলা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দু’শ টাকা এবং উপজেলা ও অন্যান্য এলাকার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দেড়শ’ টাকা নেয়া যাবে।

অতিরিক্ত ক্লাসের ক্ষেত্রে একটি বিষয়ে মাসে কমপক্ষে ১২টি ক্লাস নিতে হবে, প্রতি ক্লাসে সর্বোচ্চ ৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারবে। কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে ছাত্রছাত্রীর তালিকা, রোল, নাম ও শ্রেণী উল্লেখ করে জানাতে হবে।

দৈনিক যশোর
দৈনিক যশোর
এই বিভাগের আরো খবর