শুক্রবার   ২৩ আগস্ট ২০১৯   ভাদ্র ৭ ১৪২৬   ২১ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

৮২৩

বিয়ের পূর্বে প্রেম করা কি হারাম নাকি হালাল

প্রকাশিত: ২১ নভেম্বর ২০১৮  

আজকাল আধুনিক ছেলে মেয়েদের বিয়ের আগে প্রেম, ভালোবাসা, শারিরীক সম্পর্ক এবং সম্পর্কে তাদের ধ্যানধারণা যা তাদের মতে আধুনিকতা সামাজিকতার সঙ্গে তাল মেলানো বলে সেসবের ইসলামে অনুমোদন নেই।

আজকাল ছেলে মেয়ে বিয়ের আগে একে অপরকে বুঝার জন্য সিনেমা হলে বা পার্কে দুজন একা দেখা করা, কথা বলাকে সাধারণ এবং আধুনিক মনে করে যা ইসলাম অনুমতি দেয় না। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যার সঙ্গে বিবাহ হারাম নয় এই রকম কোনো নারীর সঙ্গে একাকী অবস্থান নিষেধ , অনুরুপ বিবাহ হারাম নয় এই রকম পুরুষের সঙ্গেও একাকি অবস্থান নিষেধ, কেননা সেখানে শয়তান তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে থাকে।’ (সহীহ মুসলিম)

ইসলামের মধ্যে সবচেয়ে নিবিড় বন্ধন একটাই, সেটা হলো বিয়ের বন্ধন। বিয়ের বন্ধনে প্রেম-ভালোবাসা সবই আছে। বিয়ের আগে প্রেম করাটা ইসলামে নিষিদ্ধ। এমনকি ইসলামের বিধিবিধান অনুসারে বিয়ের আগে প্রেম-ভালোবাসা হারাম। কারণ এইধরনের সম্পর্ক একজন মুসলমানের জন্য ঈমানী, চারিত্রিক, সামাজিক ইত্যাদি দিক থেকে ক্ষতিকর। আর সম্পর্কে কোরআন মাজীদে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন যে,

তিনি তোমাদের জন্য হালাল করে দেন পবিত্র উত্তম বস্তু আর হারাম করে দেন অপবিত্র ক্ষতিকর বস্তু।’ (সূরা: আল আরাফ, আয়াত: ১৫৭)

ইসলামে নারী পুরুষের পর্দা করার নির্দেশ শক্ত পরিষ্কার ভাষায় দেওয়া হয়েছে। যেখানে দৃষ্টি নিচু সংযত রাখা, কোমলভাবে কথা না বলা, লজ্জা স্থান হিফাজত করার কথা এবং পর্দা করার কথা বলা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা পুরুষের পর্দা প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের লজ্জা স্থানের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ তা সম্পর্কে অবগত আছেন।’ (সূরা: আন-নূর, আয়াত: ৩০)

এবং নারীদের পর্দা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, ‘ঈমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য্যকে প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, এদের ব্যতীত যেন কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য্য প্রকাশ না করে, গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্যে তারা যেন জোরে পদচারনা না করে। মুমিনগন, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সূরা: আন নুর, আয়াত: ৩১)

সূরা মায়িদাতে গোপন প্রেমলীলাকে নিষেধ করা হয়েছে সেখানে বিবাহপূর্ব প্রেম বৈধ হতে পারে কি করে? এটি একটি সুস্পষ্ট হারাম সম্পর্ক যেখানে আস্থা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধাবোধ, প্রশান্তির চেয়ে বেশি থাকে সন্দেহ, শরীরকেন্দ্রিক ভোগবাদী চিন্তা, মানসিক উত্তেজনা আর ধীরে ধীরে আত্নিক অবক্ষয়। আমরা আমাদের চারপাশে এখন হরহামেশা এগুলোই দেখছি, এখনো দেখছি এবং ভবিষ্যতেও দেখবো। আর তাই ইসলাম দুইজন নারী পুরুষকে বিয়ের পবিত্র বন্ধনে বেধে তাদের শারীরিক, আত্নিক পবিত্রতা নিশ্চিত করে। একজন স্ত্রী একজন স্বামী একে অপরের প্রতি শ্রদ্বাবোধ, আস্থা, বিশ্বাসে যে সম্পর্ক তৈরী করে সেখানেই রয়েছে যথার্থ প্রশান্তি।

তাছাড়া প্রেম বা ভালোবাসা হচ্ছে জিনা ব্যভিচারের প্রবেশপথ। ব্যভিচারের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘আর ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ মন্দ পথ।’ (সূরা: বনী ইসরাইল, আয়াত: ৩২)

জিনার নিকট যাওয়াই নিষেধ অর্থাৎ যেসকল জিনিস জিনার নিকটবর্তী করে দেয় তার কাছে যাওয়াই নিষেধ। বিবাহপূর্ব প্রেম নর-নারীকে জিনার নিকটবর্তী করে দেয় আর জিনা হচ্ছে একটি মারাত্মক কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তায়ালা এই প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘এবং যারা আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে অন্য উপাস্যর ইবাদত করে না, আল্লাহ যার হত্যা অবৈধ করেছেন, সঙ্গত কারণ ব্যতিত তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যারা একাজ করে তারা শাস্তির সম্মুখীন হবে। কেয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুন হবে এবং তথায় লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল বসবাস করবে।’ (সূরা: ফুরকান, আয়াত: ৬৮-৬৯)

নষ্ট নারীরা হচ্ছে নষ্ট পুরুষদের জন্য, নষ্ট পুরুষরা হচ্ছে নষ্ট নারীদের জন্য, (আবার) ভালো নারীরা হচ্ছে ভালো পুরুষদের জন্য, ভালো পুরুষরা হচ্ছে ভালো নারীদের জন্য, (মোনাফেক) লোকেরা (এদের সম্পর্কে) যা কিছু বলে তারা তা থেকে পাক পবিত্র; (আখিরাতে) এদের জন্যই রয়েছে ক্ষমা সম্মানজনক রিজিক।’ (সূরা: আন-নূর, আয়াত: ২৬)

ব্যাভিচারি পুরুষ কেবল ব্যাভিচারিনী নারী অথবা মুশরিক নারীকে বিয়ে করে এবং ব্যাভিচারিনীকে কেবল ব্যাভিচারি অথবা মুশরিক পুরুষ বিয়ে করে এবং এদেরকে মুমিনদের জন্য হারাম করা হয়েছে।’ (সূরা: আন-নূর, আয়াত: )

এছাড়াও বিবাহপূর্ব প্রেম অনেক সময় বান্দাকে শিরকের নিকটবর্তী করে দেয়। কারণ অনেক সময় তারা একে অপরকে এতটাই ভালোবাসা শুরু করে দেয় যে প্রকার ভালোবাসা পাওয়ার দাবীদার একমাত্র মহান আল্লাহ পাক। আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আর কোনো লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহ তায়ালার সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালোবাসা পোষন করে, যেমন আল্লাহ-তায়ালার প্রতি ভালোবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহ তায়ালার প্রতি ঈমানদার তাদের ভালোবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশি। আর কতইনা উত্তম হতো যদি জালেমরা পার্থিব কোনো কোনো আযাব প্রত্যক্ষ করেই উপলব্ধি করে নিত যে, যাবতীয় ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালারই জন্যে এবং আল্লাহ তায়ালার আযাবই সবচেয়ে কঠিনতর।’ (সূরা: আল বাকারা, আয়াত: ১৬৫)

অনেকেই মনে করে যে, কোনো নারী হিজাব অবস্থায় থাকলে (মুখ কব্জি যদি খোলা থাকে) তখন বারবার তাকানোতে দোষ নেই। আবার অনেকেই মনে করে মোবাইলে কথা বললে তো ব্যভিচারের আশংকা থাকেনা তাদের উদ্দেশ্যে হাদিসটি দেয়া হলো-

হুজুর পাক (সা.) বলেন, ‘লালসার দৃষ্টি চোখের ব্যভিচার, লালসার বাক্যালাপ জিহ্বার ব্যভিচার, কামভাবে স্পর্শ করা হাতের ব্যভিচার, উদ্দেশ্যে হেঁটে যাওয়া পায়ের ব্যভিচার, অশ্লীল কথাবার্তা শুনা কানের ব্যভিচার, কামনা-বাসনা মনের ব্যভিচার, গুপ্তাঙ্গ- যা বাস্তবে রূপদান করে কিংবা দমন করে।’ (সহীহ বোখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি) এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ব্যভিচার অনেক রকম হতে পারে। এবং প্রত্যেক ব্যভিচারই হারাম।

প্রেম ভালোবাসার পর যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ঘটে তা হলো পালিয়ে বিয়ে করে নেয়া। মা-বাবার, অভিভাবকের মতের বিরুদ্ধে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করাটাও আজকাল অনেকের জন্য একটি বিশেষ শখ আধুনিকতায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রসঙ্গে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, মহানবী (সা.) বলেছেন যে, ‘যেকোনো মহিলা যদি নিজে নিজে বিয়ে করে ফেলে কোনো যুবক বা পুরুষকে, তার অভিবাবকের অনুমতি না নিয়ে, তার ওই বিয়ে বাতিল, বাতিল, বাতিল।’ (তিরমিযি শরীফ, হাদিস নং-১০২১)

সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, অভিবাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ জায়েজ নয় বা হবে না।

সবশেষে এই নিষিদ্ধ হারাম কাজের পার্থিব পরিণতি হয় খুবই ভয়ংকর। পেটে অবৈধ বাচ্চা নিয়ে হাসপাতালে গর্ভপাত, রিকশা, সিএনজিতে মূল্যবোধ আর নৈতিকতা বিসর্জন, বয়ফ্রেন্ডের লালসার শিকার হয়ে বন্ধুবান্ধব নিয়ে গণধর্ষণ, বাজারে সেক্স ভিডিও, নিজের অসম্মান, পরিবারের অসম্মান আর সবশেষে এত অসম্মান সইতে না পেরে আত্মহত্যা। এবং পরকালের জীবনে রয়েছে সীমাহীন আযাব, দুঃখ কষ্টের জাহান্নাম।

দৈনিক যশোর
দৈনিক যশোর