মঙ্গলবার   ২০ আগস্ট ২০১৯   ভাদ্র ৫ ১৪২৬   ১৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

১৭৩

নির্বাচনী তফসিলের ভালোমন্দ

মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

প্রকাশিত: ১০ নভেম্বর ২০১৮  

নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও গঠনগত ত্রুটির কারণে প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। কমিশন অঘোষিত সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে বলে প্রতীয়মান হয়। কারণ, কমিশনে নিয়োগ দেয়ার জন্য কোনো সরকারই আইন তৈরি করেনি। ফলে সরকারের মনপসন্দ ব্যক্তিরাই কমিশনে নিয়োগ পান। বাহ্যিকভাবে লোক দেখানো সার্চ কমিটি গঠন করা হলেও কমিশনে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর পছন্দসই ব্যক্তিত্বরাই নিয়োগ পান।

ক্ষমতায় থাকা তিনটি বড় দলের কেউই নির্বাচন কমিশন গঠন করার জন্য আইন তৈরি করেনি। এর কারণ হল, প্রতিটি সরকারই চেয়েছে কমিশনে নিজের মনপসন্দ ব্যক্তি বসিয়ে তাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে। বর্তমান ইসিও একই প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়েছে। সরকার দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকলেও নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন করে সে আইনানুযায়ী ইসি গঠন করেননি।

এমনকি এ ইসি গঠনের প্রাক্কালে বিএনপি ইসি গঠনের ব্যাপারে যে ১৩ দফা সুপারিশ দিয়েছিল, তার মধ্যেও সরকারকে এ লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট আইন করতে বলা হয়নি। ফলে প্রতি ৫ বছর পরপর ইসি গঠন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করা ও তা জিইয়ে রাখার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়ী করা যায়। আর এ কারণে ইসি গঠিত হয় ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছামতো। ফলে ইসির কাজেও ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে।

বর্তমান কমিশন যেভাবে গঠিত হয়েছে সে প্রসঙ্গে ইতিপূর্বে এ কলামে একাধিকবার লিখেছি। এ কমিশনের পাঁচজনের মধ্যে ঐকমত্যের অভাব সম্পর্কেও লেখা হয়েছে। আবার অনেক সময় কমিশনারদের সঙ্গে আলোচনা না করে সিইসি একা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ নিয়ে কমিশন সদস্যদের মনকষাকষির খবর পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এমন সময় সরকারপ্রধান বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দু’দফা সংলাপ করেও তাদের দাবিগুলো মানেননি। দু’একটি প্রতিশ্রুতি দিলেও তা পালন করা হয়নি। যেমন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেফতার না করার আশ্বাস দিলেও তা কার্যকর হয়নি।

সমাবেশ করার অনুমতির প্রতিশ্রুতি দিলেও সমাবেশে আসা-যাওয়ার পথে জনগণকে পদে পদে বাধা দেয়া হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে। এমনই প্রতিকূল পরিবেশে নির্বাচন কমিশন বিরোধী ঐক্যফ্রন্টসহ আরও কতিপয় দলের অনুরোধ উপেক্ষা করে ৮ নভেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। কমিশন চাইলে সংলাপ চলমান রেখে আর কয়েকদিন পর তফসিল ঘোষণা করলে সাংবিধানিক ব্যত্যয় হতো না। কারণ, এ তফসিলে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার জন্য প্রদত্ত সময় বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করবে।

যেখানে সরকারি দল দীর্ঘদিন থেকে নির্বাচনী কাজকর্ম চালিয়ে আসছে, সেখানে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা অনেকেই জেলে। যারা বাইরে আছেন, তাদের অনেককেই গায়েবি মামলা মোকাবেলায় আদালতে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। কাজেই মনোনয়নপত্র জমা দিতে প্রার্থীদের আরেকটু বেশি সময় দেয়া উচিত ছিল। কারণ, মনোনয়নপত্র জমা দিতে হলে সময় লাগে। কাগজপত্র জোগাড় করতে হয়। অথচ প্রার্থীদের সময় দেয়া হয়েছে মাত্র ১৯ তারিখ পর্যন্ত। এর মধ্যে চার দিন সাপ্তাহিক ছুটি বাদ দিলে প্রার্থীরা সময় পাচ্ছেন মাত্র সাত দিন, যা প্রার্থীদের জন্য খুবই কম সময়।

তফসিল দেখে মনে হয় না এ কমিশনের অবাধ নির্বাচন করার ইচ্ছা আছে। কারণ, বিভিন্ন ইসির সঙ্গে বিভিন্ন সময় কমিশনের প্রধান অংশীজন রাজনৈতিক দলগুলোর যতবার সংলাপ হয়েছে, প্রতিবারই অধিকাংশ রাজনৈতিক দল রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার ইত্যাদি পদে ইসি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে অনুরোধ করেছে। এ কমিশনও যখন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছিল, তখন অধিকাংশ দল থেকে এমন পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে এ পরামর্শ যৌক্তিক। কারণ, নির্বাচন সম্পর্কে প্রশাসনের লোকদের চেয়ে যারা সারা বছর নির্বাচনের কাজ করেন, সেসব নির্বাচনী কর্মকর্তা অধিক ওয়াকিবহাল।

প্রশাসনের লোকরা ইসি কর্মকর্তাদের চেয়ে নির্বাচনী জটিলতা নিরসনে কম পারদর্শী। কারণ, প্রশাসকদের ইসি কর্মকর্তাদের মতো সবসময় নির্বাচনের কাজ করতে হয় না। তাছাড়া প্রশাসন এখন দলীয়করণকৃত। সরকারি মতাদর্শে বিশ্বাসী নন এমন প্রশাসকদের অনেক ক্ষেত্রে ওএসডি করা হয়েছে। প্রশাসকদের পদোন্নতিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের আনুকূল্যলাভ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এবারও আমরা এ ধারা লক্ষ করেছি। গত এক বছরে প্রশাসনে ব্যাপক হারে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এ রকম পদোন্নতি দেয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরকেও। কাজেই এসব প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে রিটার্নি ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ না দিয়ে ইসির উচিত জেলা ও উপজেলা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের এসব পদে ব্যবহার করা। কেন ইসি এমন কাজ করেনি সে ব্যাখ্যা তাদের দিতে হবে।

নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে ইসির কর্মকাণ্ড রহস্যজনক ও নিন্দনীয়। কারণ, এই ইসি ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্বভার গ্রহণ করার কিছুদিন পর প্রকাশ্যে বলেছিল, তারা সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করবে না। পরবর্তীকালে একাদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপেও তারা ইভিএম রাখেনি। কোন রহস্যজনক কারণে নির্বাচন নিকটবর্তী হওয়ার পর তাদের ঘাড়ে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের ভূত চাপে তা গবেষণার বিষয়।

সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে কমিশন সভায়ও ইসির পাঁচজন একমত হতে পারেননি। একজন সম্মানিত নির্বাচন কমিশনার এ ব্যাপারে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সভা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ইভিএমকে ইসি এখনও হ্যাকপ্রুফ প্রমাণ করতে পারেনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করেও ভালো ফল আসেনি। খুলনা ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মাত্র কয়েকটি কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট গ্রহণ করতে গিয়ে ইসিকে নাকানিচুবানি খেতে হয়েছে।

এ অবস্থায় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের মাধ্যমে ইসি কোনো বিশেষ দলকে ডিজিটাল কারচুপিতে সহায়তা করার সুযোগ করে দিতে চায় কিনা তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী কাজী রকিব কমিশন (২০১২-২০১৭) এবং তার পূর্ববর্তী ড. এটিএম শামসুল হুদা কমিশন (২০০৭-২০১২) ইভিএম নিয়ে অনেক মাতামাতি করেও সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করেনি। বর্তমান সিইসি কি নিজেকে পূর্ববর্তী সিইসিদের চেয়েও স্মার্ট প্রমাণ করতে চাইছেন! ময়রা তো বলেই যে আমার মিষ্টি সবচেয়ে ভালো। কিন্তু তার মিষ্টিতে কতটুকু ছানা আছে তা বোঝা যায় ওই মিষ্টির নমুনা নিয়ে যখন অন্য কয়েকজন ময়রাকে দিয়ে পরীক্ষা করানো হয়।

সিইসি মহোদয় ইভিএমের প্রশংসা করলেও জনগণ তার কথায় বিশ্বাস করছেন না। তিনি যে ইভিএম ব্যবহার করতে যাচ্ছেন তার কিছু নমুনা যদি প্রযুক্তিসমৃদ্ধ দেশের ইভিএম বিশারদদের দিয়ে পরীক্ষা করাতেন, তাহলে বোঝা যেত সেগুলো হ্যাকপ্রুফ কিনা। হ্যাকাররা গুগল, ফেসবুক যেখানে হ্যাক করে ফেলছে, সেখানে এই ইভিএম হ্যাক করা যাবে না এ নিশ্চয়তা প্রযুক্তিবিশারদ না হয়েও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বা সিইসির দেয়া শোভা পায় না।

আরপিও নিয়ে ইসি যখন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছিল, তখন কেবল সরকারি দল বাদে অধিকাংশ দল সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার বিষয়ে মতামত দিয়েছিল। গত ১ নভেম্বর থেকে গণভবনে কতিপয় দল ও জোটের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপ চলাকালে কয়েকটি দল ইসির সঙ্গেও দেখা করে। তাদের অধিকাংশই ইসিকে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করতে অনুরোধ করে। এমনকি সরকারের অংশীদার জাতীয় পার্টিও নির্বাচন কমিশনকে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার বিষয়ে মত দেয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা! সরকারি দল ইভিএম চায়, তাতেই মনে হয় সিইসি কুপোকাৎ।

বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন থেকে ফিরে ৩ অক্টোবর নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার প্রসঙ্গে জনৈক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ। আপনি সবচেয়ে প্রিয় জিনিস টাকা মোবাইল ফোনে পাঠাতে পারেন। ভোটটাও আপনার প্রিয় জিনিস, তো ভোটটাও কেন আপনি ইভিএমে দিতে পারবেন না? আমি ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে’ (বাংলা ট্রিবিউন, ০৩.১০.২০১৮)। তবে যে ইভিএমগুলো নির্বাচনে ব্যবহার করা হবে তার সক্ষমতা বিভিন্ন প্রযুক্তি বিশারদ দিয়ে পরীক্ষা করানো হয়েছে এবং এগুলো হ্যাকপ্রুফ- এমন কথা প্রশ্নকারী সাংবাদিককে বলতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা নেই, যা সংলাপকালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল উল্লেখ করেছে। দলগুলো ইসিকে এমনভাবে কাজ করতে বলেছে যাতে কমিশন জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে। কিন্তু ইসি তা করছে না। যে কারণে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ৭ দফা দাবিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন দাবি করেছে। এখন নির্বাচন যদি ভালোও হয়, ইসির সীমিত আকারে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্তটি নির্বাচনকে বিতর্কিত করবে। ভোটারদের মধ্যে শিক্ষার হার কম, তাদের মধ্যে অধিকাংশই প্রযুক্তিসচেতন নন, সেজন্য তারা মেশিনে ভোট দিতে স্বচ্ছন্দবোধ করেন না।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় দেখা গেছে, ভোটারদের বারবার বুঝিয়ে দিলেও তাদের অনেকে মেশিনে ভোট দিতে ভুল করেছেন। তাছাড়া নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী বলবেন, ইভিএমে প্রদত্ত তার প্রাপ্য ভোট অন্য প্রার্থীর অ্যাকাউন্টে চলে গেছে। সরকারি দলের দুই প্রার্থী শামীম ওসমান ও সেলিনা হায়াত আইভির মধ্যে অনুষ্ঠিত নাসিক নির্বাচনে জনাব ওসমান বলেছিলেন, ভোটাররা মেশিনে তাকে ভোট দিয়েছেন, কিন্তু সেই ভোট চলে গেছে সেলিনা হায়াত আইভির ঘরে।

ইভিএমে ভোট ঠিকমতো হচ্ছে কিনা তা দেখভালের জন্য ইসি প্রতি ভোটকেন্দ্রে ইভিএম বিশারদ নিয়োগ দিতে পারবেন না। এতদসত্ত্বেও কী কারণে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার পূর্ব প্রতিশ্রুতি খেলাফ করে ইসি তফসিলে সীমিত পরিসরে ইভিএম ব্যবহারের বিধান রেখেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক।

এ নির্বাচন কমিশনের ওপর এমনিতেই জনগণের আস্থা ছিল না, তার ওপর তাড়াহুড়ো করে তফসিল ঘোষণা, ইসি কর্মকর্তাদের অবজ্ঞা করে প্রশাসকদের রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ এবং অধিকাংশ দলের অনুরোধ উপেক্ষা করে সীমিত পরিসরে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত ভোটারদের কাছে কমিশনের ভাবমূর্তির আরও অবনমন ঘটাবে। কমিশনের উচিত হবে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ জোট ও দলের অনুরোধ আমলে নিয়ে নির্বাচনী তফসিল এখনই কিছুদিন পিছিয়ে দেয়া। তা না হলে কয়েকদিন পরে যদি সরকারি দলের অনুরোধে তফসিল পিছিয়ে দেয়া হয়, তাহলে ভোটারদের কাছে কমিশনের হুকুমবরদারি চরিত্র আরও উন্মোচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার ভাবমূর্তি বলে আর কিছু থাকবে না।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

দৈনিক যশোর
দৈনিক যশোর